এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী

দেশে কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে চায় সরকার

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বাড়াতে চায় সরকার।

তবে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং একটি টেকসই, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করা বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ প্রিপেয়ার্ডনেস ফর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অ্যান্ড রেশনাল ফর এক্সটেনশন অব দ্য প্রিপারেটরি পিরিয়ড’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সেমিনারটির আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র কাছে বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতিমূলক সময়ে বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, সরবরাহ চেইনে বিঘ্নতা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। তাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করা।’

জাতিসংঘের ওএইচআরএলএলএস পরিচালিত গ্র্যাজুয়েশন প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এলডিসি উত্তরণের জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়। তাই অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময় প্রয়োজন।’

তিনি জানান, এরই মধ্যে সরকার ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার সমন্বিত একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার, ডিরেগুলেশন, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ব্যবসা শুরু করার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছি, যাতে ১৫তম দিনে কোনো প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারে।’

তিনি আরো জানান, ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা ও ওভারল্যাপ চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে ব্যবসা করার সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’

সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনীতি ও দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মেয়াদ বৃদ্ধি ও উন্নয়ন অংশীদারদের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন।’

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত গতিশীল উল্লেখ করে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, ‘সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গতি যেন থেমে না যায় তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) গীতাঞ্জলি সিং, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, ফুটওয়্যার লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি সৈয়দ নাসিম মহ্জুর, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরাও সেমিনারে বক্তব্য প্রদান করেন। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

আরও